গোলটেবিল বৈঠকে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার

ব্যয়বহুল আমদানিতে ভোক্তা পণ্যের দাম বিশ্ববাজারের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি

দেশে উচ্চ সংরক্ষণমূলক শুল্কের বোঝা বহন করছেন ভোক্তারা।

স্থানীয় শিল্প সুরক্ষার নামে অত্যন্ত ব্যয়বহুল আমদানির কারণে ভোক্তা পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। ফলে ভোক্তার ক্ষতি হচ্ছে জিডিপির ৫ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার এমন প্রাক্কলন করেন। রাজধানীর বনানীতে পিআরআইয়ের কনফারেন্স হলে গতকাল ‘বাণিজ্যনীতি, শিল্প সুরক্ষা, বিনিয়োগের প্রভাব ও ভোক্তা কল্যাণ’ শীর্ষক এ বৈঠক আয়োজনে সহযোগিতা করেছে ফরেন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও)।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগ আনা শুধু বিডার দায়িত্ব নয়। সরকারের ভেতরে ছোট ছোট সরকার রয়েছে, যাদের সমন্বয়হীনতার কারণে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়।’

জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে না পারলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংরক্ষণবাদ চিরকাল চলতে পারে না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শিল্প গড়ে তোলা যা নিজে দাঁড়াতে সক্ষম।’

তিনি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রেক্ষাপটে নীতি থেকে বাস্তবায়নে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং জ্বালানি সংকট সমাধান ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন। এছাড়া এবারের বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হবে বলেও জানান বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধে পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার দেশের শুল্ক কাঠামো, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং রফতানি উন্নয়ন কৌশলে জরুরি সংস্কার আনার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের গড় শুল্কহার ২৮ শতাংশ, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি। প্যারা-ট্যারিফ যুক্ত হলে কার্যকর শুল্কহার প্রায় ৫৫ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২২ সালের পর থেকে মুদ্রার ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের ফলে আমদানির মূল্য ৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে এবং উচ্চ শুল্কহার ভোক্তা মূল্যবৃদ্ধি ও উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা দুর্বল করেছে।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বর্তমান কাঠামো উৎপাদক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। বিনিময় হার অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যগুলোর একটি। বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন করা হবে কিন্তু বিনিময় হার কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা বিবেচনায় নেয়া হবে না—এটা একেবারেই অযৌক্তিক।’

পিআরআই চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘১৯৯২ সালে কাস্টমস ডিউটি ৭০ থেকে বর্তমানে ১৪ শতাংশে নেমে এলেও একই সময়ে সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কসহ প্যারা-ট্যারিফ ২ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ১৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে শুল্ক উদারীকরণের সুফল অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং শুল্ক কাঠামো আরো জটিল হয়েছে।’

বাংলাদেশের শিল্পনীতিতে একটি সুস্পষ্ট রফতানিবিরোধী পক্ষপাত বিদ্যমান—দাবি করে ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ‘আমদানি বিকল্প শিল্পে গড় সুরক্ষা ২৮ শতাংশ হলেও গড় রফতানি ভর্তুকি মাত্র ৭ শতাংশ। ফলে পোশাকবহির্ভূত পণ্যের রফতানি স্থবির হয়ে পড়েছে এবং নগদ সহায়তা প্রধান নীতি উপকরণ হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।’

অনুষ্ঠানে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘দেশে ব্যবসা করা যেন বড় ধরনের অন্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসায়ীদের সৎভাবে ব্যবসা করার মতো পরিবেশ রাখা হয়নি এবং এর জন্য আমলাতন্ত্র দায়ী।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকার ৬-৮ হাজার কোটি টাকা নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে। কিন্তু এসব না দিয়ে জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।’

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ নীতিনির্ধারণে এনবিআর ও মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব তুলে ধরে বলেন, ‘অতিরিক্ত সুরক্ষাবাদ রফতানি বহুমুখীকরণে বাধা সৃষ্টি করছে।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘কিছু শিল্প অতিরিক্ত সুরক্ষা পেলেও অনেক শিল্প কোনো সুরক্ষাই পায় না।’ তিনি নীতিনির্ধারণ নয়, বরং বাস্তবায়নে এনবিআরের ভূমিকা জোরদারের আহ্বান জানান।

ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী জানান, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ও দক্ষ স্থানীয় শিল্প ভোক্তাদের জন্য উপকারী হবে।

অনুষ্ঠানে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, ‘উচ্চ সুরক্ষামূলক শুল্কের পরিবর্তে সমন্বিত বাণিজ্য, শিল্প, বিনিয়োগ ও করনীতির মাধ্যমে রফতানিমুখী অর্থনৈতিক ভিশন প্রয়োজন।’

আরও